কল্পনা করুন, এক বুনো নদী বহুদূর পাহাড়ের গহ্বর থেকে জন্ম নিয়েছে। তার কোনো পরিচিত উৎস নেই, আশপাশে সুবিস্তৃত জলধারা নেই, এমনকি পথচলার জন্য প্রস্তুত কোনো প্রশস্ত খালও নেই। তারপরও, সেই নদী সামনে এগিয়ে চলে। পাথরের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়, রৌদ্রের উত্তাপে কখনো শুকিয়ে যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠিকই গতি ফিরে পায় এবং বিশাল সমুদ্রে গিয়ে মিশে।
আপনার গল্পটাও অনেকটা সেই নদীর মতো। যদি আপনি এমন একটি প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে থাকেন, যেখান থেকে IBA-তে সুযোগ পাওয়া অত্যন্ত বিরল, তাহলে অনেকেই আপনাকে নিরুৎসাহিত করবে। তারা বলবে, "IBA মূলত নির্দিষ্ট কয়েকটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকেই শিক্ষার্থী গ্রহণ করে।" পরিসংখ্যানও হয়তো তাদের কথাকে সমর্থন করবে—IBA-তে চান্স পাওয়া ১২০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজনই অখ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে আসেন।
কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতা আপনাকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বরং আপনাকে আরও অনুপ্রাণিত করার জন্য। আপনি যদি IBA-তে প্রবেশ করতে পারেন, তাহলে আপনার গল্পটি হবে অনন্য। সেটি হবে এক সংগ্রামের গল্প, এক অসাধারণ সাফল্যের গল্প, যেখানে কঠোর বাস্তবতাকে জয় করে আপনি নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। তাই এই কঠিন পরিসংখ্যান দেখে নিরুৎসাহিত হওয়ার কিছু নেই; বরং এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করুন। প্রতিযোগিতা যখন কঠিন, তখন বিজয়ের মাহাত্ম্যও বহু গুণ বেড়ে যায়।
প্রস্তুতি শুধু IBA-এর জন্য নয়, বরং নিজের উন্নতির জন্য
IBA-তে চান্স পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি বিশাল অর্জন, কিন্তু সেটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে আপনি শুধু IBA নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফল হতে পারেন।
১. ইংরেজি ভাষার দক্ষতা বৃদ্ধি করুন
IBA হোক বা না হোক, জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইংরেজি ভাষার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি নিজেকে একজন ভবিষ্যৎ কর্পোরেট লিডার বা উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে চান, তাহলে স্পষ্টভাবে চিন্তা প্রকাশের ক্ষমতা থাকতে হবে। শুধুমাত্র লিখিত পরীক্ষার জন্য ইংরেজি শেখার প্রয়োজন নেই; বরং আত্মপ্রকাশের জন্য, যোগাযোগ দক্ষতার জন্য, এবং আত্মবিশ্বাসীভাবে যুক্তি তুলে ধরার জন্য ইংরেজিতে সাবলীল হতে হবে।
প্রতিদিন কিছু সময় ইংরেজি পড়ার এবং লেখার অভ্যাস করুন। ভালো বই পড়ুন, সংবাদপত্র পড়ুন, এবং নিজের চিন্তাভাবনা ইংরেজিতে প্রকাশের চেষ্টা করুন। শুধু গ্রামার শেখাই যথেষ্ট নয়; বরং কীভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে হয় বা লিখতে হয়, তা রপ্ত করুন।
২. বিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করুন—বিশেষ করে নিজের ক্যারিয়ারের জন্য
IBA-তে চান্স পাওয়া মানেই আপনি ভবিষ্যতের কর্পোরেট জগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। তাই ব্যবসা, অর্থনীতি, এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। আপনি যদি বিজনেস নিয়ে পড়তে চান, তাহলে কীভাবে স্টার্টআপ গড়ে ওঠে, কীভাবে বড় কোম্পানিগুলো পরিচালিত হয়, কিংবা কীভাবে বিশ্ববাজার কাজ করে—এসব সম্পর্কে জানতে হবে।
আপনার স্বপ্নের ক্যারিয়ার যদি ফিন্যান্স, মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্ট বা প্রযুক্তি নিয়ে হয়, তাহলে আপনাকে সেসব বিষয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। বিশ্বজুড়ে কী পরিবর্তন আসছে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসাকে কীভাবে বদলে দিচ্ছে? টেক স্টার্টআপগুলো কীভাবে নতুন ট্রেন্ড তৈরি করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি আপনি খুঁজতে থাকেন, তাহলে আপনার প্রস্তুতি অন্যদের থেকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ হবে।
৩. স্মার্ট চিন্তক হন—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে
IBA-তে চান্স পাওয়ার জন্য শুধু তথ্য মুখস্থ করলেই হবে না, বরং আপনাকে হতে হবে একজন বুদ্ধিমান চিন্তক। প্রতিদিনের জীবনে সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন তুলুন। প্রচলিত সমাধানের বাইরে গিয়ে ভাবুন—একটি সমস্যার কি অন্য কোনো বিকল্প সমাধান হতে পারে? স্ট্র্যাটেজিক চিন্তার চর্চা করুন, যাতে আপনি যেকোনো পরিস্থিতিতে কৌশলী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
একটি সাধারণ অভ্যাস তৈরি করুন—প্রতিদিন নিজের চারপাশের একটি বিষয় নিয়ে ভাবুন এবং প্রশ্ন করুন: "আমি যদি ভিন্নভাবে এটি করতাম, তাহলে কী হতো?" এটি ব্যবসায়, পড়াশোনায়, বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও কাজে লাগবে।
৪. কিছু মৌলিক দক্ষতা অর্জন করুন
IBA-তে শুধু একাডেমিক জ্ঞান দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। আপনাকে এমন কিছু দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যা আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে।
- MS Office (Word, Excel, PowerPoint): ভবিষ্যতের কর্পোরেট জীবনে এগুলো না জানলে পিছিয়ে পড়বেন। যদি এখনো শেখার সুযোগ না হয়ে থাকে, তাহলে ইউটিউব টিউটোরিয়াল বা অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে শিখে ফেলুন।
- প্রেজেন্টেশন দক্ষতা: IBA-তে প্রবেশের পর প্রায় প্রতিটি কোর্সেই আপনাকে প্রেজেন্টেশন দিতে হবে। ভালোভাবে কথা বলা, যুক্তি সাজিয়ে ব্যাখ্যা করা, এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করার দক্ষতা অর্জন করুন।
- যদি কোনো বিশেষ দক্ষতা না থাকে, তবে অন্য কিছু করে দেখান: যদি এখনো নির্দিষ্ট কোনো স্কিল শেখা না হয়ে থাকে, তাহলে এমন কিছু করুন যা আপনার আত্মপ্রকাশের অনন্যতা দেখাবে। হতে পারে আপনি কোনো ক্লাবে ছিলেন, কোনো প্রজেক্ট করেছেন, বা সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন—এসবও আপনাকে আলাদা করে তুলবে।
কঠিন বাস্তবতা মানেই হেরে যাওয়া নয়
অনেকেই কঠিন প্রতিযোগিতা দেখে ভয় পায়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সবচেয়ে বড় বিজয়ীরাই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আপনি যদি অখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠান থেকে এসেও IBA-তে চান্স পান, তাহলে সেটিই হবে আপনার গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক।
তাই হতাশ হবেন না। জীবনের প্রতিটি দিন আপনার জন্য একটি নতুন সুযোগ। আপনি কীভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগাবেন, সেটাই আসল বিষয়। মনে রাখবেন—IBA শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের নাম নয়, বরং এটি আপনার আত্মপ্রকাশের সুযোগ। সেই সুযোগ আপনি কীভাবে কাজে লাগাবেন, সেটি আপনার সিদ্ধান্ত।
আপনি কি প্রস্তুত নিজের গল্প লিখতে?
Best Regards,
Magnus Sam